আলীকদম–থানচিসহ দুর্গম সড়কে সতর্কতা জরুরি, অভিজ্ঞ পাহাড়ি চালক বেছে নেওয়ার পরামর্শ
ভিশন ডেস্ক রিপোর্ট
বান্দরবান: পর্যটন মৌসুমে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বান্দরবানের আলীকদম, থানচি, রুমা ও জেলা সদরে ছুটছেন দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা। কিন্তু আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, খাড়া ঢাল, গভীর খাদ আর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা। গত কয়েক দিনে আলীকদম–থানচি সড়কসহ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি সড়কে একাধিক যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় হতাহতের খবরও পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো পর্যালোচনায় একটি বিষয় সামনে এসেছে—দুর্ঘটনাকবলিত অনেক যানবাহন সমতল এলাকার সড়কে চলাচলে অভ্যস্ত এবং চালকদের কারও কারও পাহাড়ি সড়কে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা সীমিত। স্থানীয় পর্যবেক্ষণে এমন প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের ৯০ শতাংশ সম্পর্কে কোনো যাচাইকৃত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
পাহাড়ি সড়কে গাড়ি চালানো সমতলের তুলনায় অনেক বেশি সতর্কতা ও বিশেষ দক্ষতার দাবি রাখে। কোথাও সরু রাস্তা, কোথাও তীব্র বাঁক, আবার কোথাও এক পাশেই গভীর খাদ। বৃষ্টি হলে পিচ্ছিল হয়ে ওঠে সড়ক; কুয়াশা ও কম দৃশ্যমানতা বাড়িয়ে দেয় ঝুঁকি। এসব পরিস্থিতিতে সামান্য অসতর্কতা কিংবা গাড়ি নিয়ন্ত্রণে দক্ষতার ঘাটতি বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
স্থানীয় অভিজ্ঞ চালক থাকতেও ঝুঁকি কেন?
আলীকদম থেকে থানচি, রুমা ও বান্দরবান যাতায়াতের জন্য স্থানীয়ভাবে পরিচালিত পর্যটক পরিবহনের পাশাপাশি এসব সড়কে নিয়মিত চলাচল করেন এমন অনেক অভিজ্ঞ চালক রয়েছেন। পাহাড়ি পথের বাঁক, ঢাল, রাস্তার অবস্থা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সম্পর্কে তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
অথচ পর্যটন মৌসুমে অনেকেই নিজস্ব গাড়ি কিংবা সমতলে চলাচলে অভ্যস্ত চালক নিয়ে পাহাড়ে ভ্রমণে আসেন। পাহাড়ি সড়কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকলে এসব চালকের জন্য দুর্গম পথ সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে অপরিচিত সড়কে অতিরিক্ত গতি, ভুলভাবে বাঁক নেওয়া, বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িকে পাশ দিতে গিয়ে অসতর্কতা এবং ব্রেক ব্যবহারে ভুলের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ আলাদাভাবে তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। চালকের অনভিজ্ঞতার পাশাপাশি গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি, সড়কের অবস্থা, আবহাওয়া ও অন্যান্য কারণও বিবেচনায় নিতে হবে।
পর্যটকদের জন্য জরুরি পরামর্শ
পাহাড়ে ভ্রমণের আনন্দ যেন দুর্ঘটনার বিষাদে পরিণত না হয়, সে জন্য পর্যটকদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত, অভিজ্ঞ চালক নির্বাচন করুন। আলীকদম–থানচি, রুমা কিংবা বান্দরবানের দুর্গম সড়কে যাতায়াতের আগে পাহাড়ি পথে নিয়মিত গাড়ি চালান এমন দক্ষ ও অভিজ্ঞ চালক নেওয়ার চেষ্টা করুন।
দ্বিতীয়ত, গাড়ির সক্ষমতা যাচাই করুন। যাত্রার আগে ব্রেক, টায়ার, স্টিয়ারিং, লাইটসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করুন। পাহাড়ি সড়কের উপযোগী নয়-এমন যানবাহন নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রা করবেন না।
তৃতীয়ত, অতিরিক্ত গতি এড়িয়ে চলুন। পাহাড়ি সড়কে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করা কিংবা বাঁকে হর্ন ও নিরাপদ দূরত্বের নিয়ম উপেক্ষা করা বিপদের কারণ হতে পারে।
চতুর্থত, আবহাওয়া ও সড়কের অবস্থা জেনে নিন। ভারী বৃষ্টি, কুয়াশা, ভূমিধসের আশঙ্কা কিংবা সড়কে প্রতিবন্ধকতা থাকলে যাত্রার সময় পরিবর্তন করুন। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিন।
পঞ্চমত, চালককে অযথা চাপ দেবেন না। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য চালককে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে উৎসাহিত করবেন না। যাত্রাপথে চালক ক্লান্ত হয়ে পড়লে বিশ্রামের সুযোগ দিন।
ষষ্ঠত, গাড়িতে যাত্রীসংখ্যা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। অতিরিক্ত যাত্রী বহন থেকে বিরত থাকুন এবং সিটবেল্ট থাকলে তা ব্যবহার করুন। শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন।
পর্যটন নিরাপত্তায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবহনমালিক ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাহাড়ি সড়কে চলাচলকারী পর্যটক পরিবহনের চালকদের দক্ষতা যাচাই, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করার উদ্যোগ দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
একই সঙ্গে পর্যটকদের ভ্রমণের আগে নির্ভরযোগ্য পরিবহন নির্বাচন এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত অভিজ্ঞ চালকদের সেবা নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা জরুরি।
বান্দরবানের পাহাড়, ঝরনা, নদী ও প্রকৃতির সৌন্দর্য পর্যটকদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। কিন্তু এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যেন কারও জীবন বিপন্ন না হয়, সেটিই হওয়া উচিত সবার প্রধান বিবেচনা।
মনে রাখতে হবে, পাহাড়ি পথে গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছানোর চেয়ে নিরাপদে পৌঁছানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


