একদিন রাজা মশাই তাঁর রাজকীয় বহর নিয়ে পথপরিক্রমায় বের হয়েছেন। হুট করেই মেঠোপথের বাঁকে তাঁর চোখ আটকে গেল—এক অনিন্দ্যসুন্দরী যুবতী হেঁটে আসছে। রাজার প্রখর দৃষ্টি আর অভিজ্ঞ অভিজ্ঞতা বলে, মেয়েটির বয়স কোনোভাবেই একুশের বেশি নয়। রূপে যেন শরতের পূর্ণিমাকেও হার মানায়। রাজপ্রাসাদের সীমানা পেরিয়ে সাধারণ ধূলিময় পথে এমন অপরূপা রূপসী দেখা রাজার কাছে রূপকথার মতোই অকল্পনীয় ঠেকলো।
রাজা কৌতূহল সামলাতে না পেরে তাঁর বিশ্বস্ত এক মন্ত্রীকে পাঠালেন পরিচয় জানতে। মন্ত্রী কাছে গিয়ে শুধাতেই মেয়েটি ছলছল চোখে বলতে শুরু করল, “প্রভু, আমি এই চন্দ্রপুরের কেউ নই। বহুদূরে, একের পর এক প্রমত্তা নদী পেরিয়ে ‘পঞ্চম ডাঙ্গা’ নামের এক গাঁয়ে ছিল আমার ঘর। কিন্তু রাক্ষসী নদী আমার বাড়িঘর, ভিটেমাটি সব গিলে খেয়েছে। শুধু ভিটে নয়, বুকফাটা স্রোত কেড়ে নিয়েছে আমার জন্মদাতা বাবা, আদরের মা আর ছোট্ট ভাইটিকেও। আমি এখন নিঃস্ব, একা, ঘরহীন এক যাযাবর। বহু আগে শুনেছিলাম চন্দ্রপুরের মানুষ খুব কোমল হৃদয়ের, দয়াবান। সেই একটু আশ্রয়ের আশায় এই পথ ধরে হাঁটছিলাম…” কথাগুলো শেষ হতেই মেয়েটির চোখ বেয়ে শ্রাবণের ধারা নেমে এলো।
মন্ত্রীর মুখে এই করুণ ট্র্যাজেডি শুনে রাজার কঠোর মন নিমেষেই মায়ায় গলে গেল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, অনাথ মেয়েটিকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে গিয়ে নতুন এক জীবন দেবেন। প্রাসাদে পৌঁছে রানীকে সব বলতেই, দয়ালু রানীও পরম মমতায় মেয়েটিকে বুকে টেনে নিলেন। থাকার চমৎকার ব্যবস্থা হলো, রাজকীয় খাবারের আয়োজন হলো। পরদিনই রানী স্বয়ং মেয়েটিকে নিয়ে নগরীর সেরা বিপণিবিতানে গেলেন—কিনে দিলেন দামি রেশমি পোশাক, অলংকার আর নাগরা জুতো। মেয়েটির চোখে তখন এক অলৌকিক আনন্দের দ্যুতি। সে তো চেয়েছিল কেবল মাথার ওপর এক চিলতে ছাদ, আর বিধাতা যেন তাকে এনে দিয়েছেন আস্ত এক স্বর্গ!
কিন্তু রাজপ্রাসাদের সেই সুখের দিনগুলো বেশিদিন স্থায়ী হলো না। সময়ের সাথে সাথে অনাত্মীয় আশ্রয়দাত্রীর রূপ দেখতে দেখতে রাজা মশাই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালেন; তিনি মেয়েটির প্রেমে অন্ধ হয়ে উঠলেন। রাজা তাঁর অনুভূতির কথা বলতেই মেয়েটি শিউরে উঠলো—যে রানী তাকে বোনের মতো আশ্রয় দিয়েছেন, তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা অসম্ভব! কিন্তু রাজার ক্ষমতা, অব্যাহত চাপ আর মধুর ছলনাবাক্যের কাছে নিঃস্ব মেয়েটি একসময় নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলো। একপর্যায়ে মায়ার জালে জড়িয়ে মেয়েটি সত সত্যিই রাজাকে ভালোবেসে ফেললো।
গোপন এই প্রণয় আরও গভীর হলো, এবং মেয়েটির গর্ভে এলো রাজার সন্তান। কিন্তু রাজকীয় সম্মান ও সিংহাসন বাঁচানোর দোহাই দিয়ে নিষ্ঠুর রাজা জন্ম নেওয়ার আগেই সেই নিষ্পাপ প্রাণটিকে ধ্বংস করে দিলেন। প্রেমিকা বুকভাঙা কান্না চেপে রাজাকে আকুতি জানালো, “আমাকে রাজরানীর মর্যাদা না দাও, অন্তত স্ত্রীর পরিচয়টুকু দাও।” রাজা বরাবরের মতোই মিষ্টি হেসে বললেন, “অবশ্যই করব, আমাকে শুধু কিছুটা সময় দাও।”
সেই সময় গড়িয়ে বছর পার হতে লাগলো, কিন্তু রাজার সেই ‘সময়’ আর শেষ হলো না। মিথ্যে আশার আলো আঁকড়ে মেয়েটি প্রহর গুনতে লাগলো। কিন্তু পাপ কখনো চাপা থাকে না। একদিন রানী সমস্ত সত্য জেনে ফেললেন। চরম বিশ্বাসঘাতকতায় রুদ্ধ হয়ে রানী কালবিলম্ব না করে মেয়েটিকে রাজপ্রাসাদ থেকে চিরতরে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
যে রূপকথা শুরু হয়েছিল এক রাজকীয় আশ্রয়ে, তা শেষ হলো তীব্র ধোঁকাবাজিতে। দামি পোশাক আর গহনা খুলে আবার রাজপথের ধুলোয় এসে দাঁড়াতে হলো মেয়েটিকে। আলো ঝলমলে প্রাসাদের মিথ্যা মোহ কাটিয়ে সে আবার ফিরে গেল তার সেই নিঃসঙ্গ, অন্ধকার ও গৃহহীন অতীতে—যেখান থেকে শুরু করেছিল, ঠিক সেখানেই।
গল্পের শিক্ষা:
১.অন্ধ বিশ্বাস ও আশ্রয়ের অপব্যবহার:সাময়িক আশ্রয় বা উপকার পেলেই কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা উচিত নয়। শক্তির মুখে বা আবেগের তোড়ে নিজের নীতি বিসর্জন দিলে দিনশেষে পরিণতি হয় নিঃসঙ্গতা।
২.ক্ষমতাশালীদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি: যারা নিজের স্বার্থ ও পদের মোহে অন্যের জীবন নিয়ে খেলে, তাদের প্রতিশ্রুতি কখনোই স্থায়ী হয় না। পুরুষের বা ক্ষমতাবানের সাময়িক মোহকে কখোনো ‘ভালোবাসা’ ভেবে ভুল করতে নেই।
৩.পাপের পরিণতি চিরকাল ভয়াবহ: অন্যায় ও অসৎ উপায়ে অর্জিত কোনো সুখ বা সম্পর্ক কখনো স্থায়ী হয় না; সাময়িক রাজকীয় বিলাসিতা শেষে মানুষকে আবার সেই শূন্যতার বাস্তবতায় ফিরতেই হয়।
_________ সৈয়দা ফারিয়া জাহান
_______________________ কলমের ক্যানভাস





