জমনত গঠনের লক্ষে
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, বর্গা শিক্ষক দিয়ে পাঠদান এবং সরকারি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন শুধু শিক্ষা খাতের সংকট নয়; বরং সত্য, দায়িত্বশীলতা এবং জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
অভিযোগের সূত্রপাত হয় স্থানীয় অভিভাবক, পাড়া কারবারি ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগের ভিত্তিতে। পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যম তথ্য-প্রমাণসহ সংবাদ প্রকাশ করলে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা উঠে এসেছে বলে জানা যায়। এমনকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করেছেন, যার ভিডিও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এসব বাস্তবতা সামনে আসার পরও একটি মহল মূল অনিয়মের জবাব না দিয়ে ভিন্নখাতে আলোচনা নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিছু তথাকথিত সাংবাদিক ও অনলাইন AI প্ল্যাটফর্ম থেকে কোনো ধরনের তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই “সাংবাদিকরা শিক্ষকদের কাছে চাঁদা দাবি করেছে” এমন অভিযোগ প্রচার করা হচ্ছে। অথচ অভিযোগের পক্ষে দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ, অডিও, ভিডিও বা আইনি নথি এখনো জনসম্মুখে উপস্থাপন করা হয়নি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাংবাদিকতার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা ও পেশাগত মানদণ্ড ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, AI বা নামসর্বস্ব পোর্টাল ব্যবহার করে কাউকে অভিযুক্ত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ, এতে প্রকৃত সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সুস্পষ্ট বক্তব্য এবং শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্তের পরও শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদ করার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের তদন্ত ও বক্তব্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে প্রতিবাদ জানানো পরোক্ষভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যকে অসত্য বলার সামিল কি না, সে প্রশ্ন এখন জনমনে উঠছে।
মূল সমস্যা হলো, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অধিকার, বিদ্যালয়ে শিক্ষকের উপস্থিতি এবং দুর্গম এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন। কিন্তু এখন সেই আলোচনাকে সরিয়ে এনে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপপ্রচার ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের দিকে নেওয়া হচ্ছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ অনিয়মিত শিক্ষক ও বর্গা শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি এবং শিক্ষার মান রক্ষায় জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
রাষ্ট্র একজন শিক্ষককে শুধু বেতন দেয় না, জাতি গঠনের দায়িত্বও দেয়। তাই অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটির স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। একইসঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটিও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে “চাঁদাবাজ” আখ্যা দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি অনিয়মকে আড়াল করাও সমানভাবে ক্ষতিকর।
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখন প্রয়োজন সংঘাত নয়, সত্য উদঘাটন ও কার্যকর জবাবদিহি।





