| পাঁচ বনবিটে হাজারো পাকা স্থাপনা, পাহাড় কেটে বনভূমি দখল; নলবিলা চেক স্টেশনে কাঠবাহী গাড়ি থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ |
এস.এম. হুমায়ুন কবির, কক্সবাজার ব্যুরোচীফ।
কক্সবাজারের ফাঁসিয়াখালী বন রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল যেন দখলদার ও বনজ সম্পদ লুটেরাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। পাহাড় কেটে বনভূমি দখল, সংরক্ষিত বনের গাছপালা উজাড় করে পাকা বাড়িঘর, খামার ও বাগান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। শুধু বনভূমি দখলই নয়, রেঞ্জের আওতাধীন নলবিলা চেক স্টেশনে কাঠবোঝাই যানবাহন থেকে নিয়মিত লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়েরও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।ফাঁসিয়াখালী বন রেঞ্জের অধীনে রয়েছে পাঁচটি বনবিট। এগুলো হলো-ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, মানিকপুর, কাকারা ও নলবিলা বনবিট কাম চেক স্টেশন। এসব বনবিটের মোট বনভূমির পরিমাণ ১৩ হাজার ৬০১ একর। বিশাল এই বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা (রেঞ্জ প্রশিক্ষণরত) সহকারী বন সংরক্ষক মো. কামরুল হাসান।স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ফাঁসিয়াখালী বনবিটের উচিতার বিল মৌজার ফতেহার ঘোনা এলাকায় গত ছয় মাসে সরকারি বনভূমির পাহাড় কেটে অন্তত ২০টির বেশি পাকা বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। একইভাবে পুরো ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের পাঁচটি বনবিটে অন্তত এক হাজার পাকা বাড়িঘর গড়ে উঠেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট বনবিট কর্মকর্তা ও রেঞ্জ কার্যালয়ের দায়িত্বশীলদের ম্যানেজ করেই সরকারি বনভূমিতে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছপালা কেটে বনভূমি দখলের পাশাপাশি কোথাও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সরকারি জমি ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও ড্রেজার ও এক্সকেভেটর বসিয়ে দিন-রাত বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি আশপাশের কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহও হুমকির মুখে পড়ছে।স্থানীয়দের অভিযোগ ও বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের রংমহল, গোলাপপাড়ি, হারবাং ও কুতুবদিয়া এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমির বিভিন্ন অংশ দখলের অভিযোগ রয়েছে। বনের গাছপালা কেটে জমি সমতল করে সেখানে স্থাপনা, খামার ও বাগান গড়ে তোলার অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ফাঁসিয়াখালী এলাকার কোচাখালী বনবিটের আওতাধীন ৬১ ও ৭০ নম্বর দাগে প্রায় ১৫ একর সরকারি বনভূমি দখল এবং বনায়নের গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি জমিতে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ব্যক্তিগত বাগান তৈরির ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।অন্যদিকে, ফাঁসিয়াখালী ছড়া, খাল ও বসতভিটার আশপাশে ড্রেজার ও এক্সকেভেটর দিয়ে অবৈধভাবে বালু-মাটি উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ছড়া ও খালের স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন, মাটির ক্ষয়, বসতবাড়ি ভাঙন এবং কৃষিজমির ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও গাছ নিধনের কারণে বৃষ্টির পানি ধারণের প্রাকৃতিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
নলবিলা চেক স্টেশনে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ:
ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের নলবিলা বনবিট কাম চেক স্টেশনকে ঘিরেও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। বন বিভাগের একটি সূত্রের দাবি, পার্বত্য জেলাগুলোসহ টেকনাফ, উখিয়া, রামু, নাইক্ষ্যংছড়ি ও বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহনে শত শত কাঠবোঝাই গাড়ি এই চেক স্টেশন অতিক্রম করে। এসব গাড়ি থেকে চেক স্টেশনে দায়িত্ব পালনকারী বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।এর নেতৃত্বে রয়েছেন বিট কর্মকর্তা আবদুল ওয়াহাব। বন বিভাগের একটি সূত্রের দাবি, এসব অর্থের একটি অংশ বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়।স্থানীয়দের প্রশ্ন, বনজ সম্পদ পরিবহনের নামে যদি নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায় হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিদিন শত শত কাঠবোঝাই গাড়ি কীভাবে নির্বিঘ্নে চেক স্টেশন অতিক্রম করছে? বনজ সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে থাকা চেক স্টেশনই যদি অনিয়মের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তাহলে বন উজাড় ও কাঠ পাচার ঠেকাবে কে?স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, পাঁচটি বনবিটে বনভূমি দখল, গাছ কর্তন, পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি এবং নলবিলা চেক স্টেশনকেন্দ্রিক অর্থ আদায়ের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বন রক্ষক নাকি বন উজাড়ের সহযোগী?:
সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষার দায়িত্ব বন বিভাগের। অথচ সেই বনাঞ্চলে বছরের পর বছর বনভূমি দখল, গাছ নিধন, পাহাড় কাটা এবং অবৈধভাবে বালু-মাটি উত্তোলনের অভিযোগ উঠছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল পরিমাণ বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের ঘটনা সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগোচরে কীভাবে সম্ভব? নিয়মিত নজরদারি ও দায়িত্ব পালনে ঘাটতি রয়েছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো প্রভাবশালী যোগসাজশ-তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, বন বিভাগের নথি, মামলা এবং এলাকাবাসীর ধারাবাহিক অভিযোগ থেকে স্পষ্ট যে ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সরকারি বনভূমি রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বালু-মাটি উত্তোলন বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী বন সংরক্ষক মো. কামরুল হাসান বলেন, ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের পাঁচটি বনবিটে জবরদখল, গাছ কর্তন ও বনের পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। পাকা বাড়িঘর স্থাপনের ঘটনায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেন বলেন, যেকোনো অপরাধের বিষয়ে বন প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশ সচেতন মহলের দাবি, শুধু মামলা দায়ের কিংবা জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়ে বনাঞ্চল রক্ষা সম্ভব নয়। ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের পাঁচটি বনবিটের দখল হয়ে যাওয়া বনভূমির পূর্ণাঙ্গ জরিপ, নলবিলা চেক স্টেশনের কাঠবাহী যানবাহনের রেজিস্টার ও রাজস্ব আদায়ের হিসাব নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখতে হবে।এটি রাষ্ট্রের সম্পদ, প্রকৃতির ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন। বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই যদি বনজ সম্পদ লুটপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তবে সেই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।








