ভিশন২৪বাংলা ডেস্ক নিউজ

পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা দুর্গম পথ। চারপাশে সবুজ পাহাড় আর ছোট ছোট জনপদ। এসব জনপদের শিশুদের কাছে বিদ্যালয় মানেই ছিল একটু ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের এক আঘাতে সেই স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই থমকে গিয়েছিল। বিধ্বস্ত হয়েছিল বিদ্যালয় ভবন ও ছাত্রাবাস। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পাঠদান। অনিশ্চয়তায় পড়ে গহিন পাহাড়ের চার পাড়ার অর্ধশতাধিক শিশুর শিক্ষাজীবন।

তবে সেই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শিশুদের শিক্ষার অধিকার ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে আসে প্রশাসন। ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নতুন করে নির্মাণ করা হয় বিদ্যালয় ভবন ও ছাত্রাবাস। মঙ্গলবার নতুন ভবন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বুঝিখাল ম্রো প্রাথমিক বিদ্যালয়। যেন ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে আবারও জেগে উঠেছে শিশুদের স্বপ্ন।

বিদ্যালয়টির অবস্থান আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। ২০২২-২৩ সালে স্থানীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে আশপাশের চার পাড়ার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু পড়াশোনা করত। ওই এলাকার শিশুদের শিক্ষার জন্য কাছাকাছি আর কোনো বিদ্যালয় না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি ছিল তাদের একমাত্র ভরসা।

গত ১২ থেকে ১৪ জুলাই টানা প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের প্রভাবে বিদ্যালয় ভবন ও ছাত্রাবাস বিধ্বস্ত হয়। বন্ধ হয়ে যায় পাঠদান। একদিকে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো হারিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন অভিভাবকেরা। দুর্গম পাহাড়ের এসব শিশুর শিক্ষাজীবন কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।

এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়টির দুরবস্থা ও শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নজরে আসে আলীকদম উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও শিক্ষক নুরুল ছাফা ভূঁইয়া বাবুর। শিশুদের শিক্ষাজীবন রক্ষায় তিনি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহকে অবহিত করেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিষয়টি বান্দরবানের জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌসকে জানান। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুর আলম বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণে উদ্যোগ নেন।

এরপর প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় নতুন ভবন ও ছাত্রাবাস নির্মাণের কাজ। ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত দুটি ভবনেই রয়েছে তিনটি করে কক্ষ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে শিশুদের জন্য ফিরে আসে শ্রেণিকক্ষ ও আবাসনের সুযোগ।

মঙ্গলবার সকালে নতুন ভবন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহ। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটান এবং তাদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ ও উপহার বিতরণ করেন। পরে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।

বিদ্যালয়টির পুনর্নির্মাণে আনন্দিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। প্রধান শিক্ষক গর্ডেন ত্রিপুরা বলেন, প্রবল বৃষ্টিতে বিদ্যালয়টি ভেঙে পড়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। এ উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

স্থানীয় পাড়ার কারবারি দমলয় মুরুং বলেন, এখানে চারটি পাড়ার মানুষ বসবাস করেন। শিশুদের পড়াশোনার জন্য আশপাশে আর কোনো বিদ্যালয় নেই। ২০২২-২৩ সালে বেসরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পাহাড়ের শিশুদের ভবিষ্যতের একমাত্র আশার জায়গা এই বিদ্যালয়। বৃষ্টিতে স্কুলটি ভেঙে যাওয়ায় আমরা খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এখন আবার বিদ্যালয়টি গড়ে ওঠায় আমাদের সন্তানদের স্বপ্ন ফিরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সহযোগিতায় দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে।

বিদ্যালয়টির পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়ে বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সজীব কান্তি রৌদ্র বলেন, বিদ্যালয়টি ভেঙে পড়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন। তাঁর আগের জেলা প্রশাসকও কয়েকবার বিদ্যালয়টির পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। তিনিও নিয়মিত সর্বশেষ তথ্য জানিয়েছেন।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুর আলম বলেন, অতিবৃষ্টিতে বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মতভাবে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করাই ছিল প্রশাসনের লক্ষ্য।

তবে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ হলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি সামনে এনেছেন স্থানীয় নেতারা। সাবেক আলীকদম উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলফিকার আলী ভুট্টু বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এখানে শিক্ষক সংকট রয়েছে। এ সংকট নিরসনে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

পাহাড়ি ঢলে বিধ্বস্ত হয়েছিল ভবন, থেমে গিয়েছিল শিশুদের পড়াশোনা। কিন্তু স্থানীয়দের উদ্যোগ, সংশ্লিষ্টদের প্রচেষ্টা ও প্রশাসনের সহযোগিতায় আবারও দাঁড়িয়েছে বুঝিখাল ম্রো প্রাথমিক বিদ্যালয়। নতুন ভবন ঘিরে চার পাড়ার শিশুদের চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্নের পূর্ণতা নির্ভর করছে নিয়মিত পাঠদান, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর।

🖨️ প্রিন্ট নিউজচ্যানেল স্টাইল ফটো-কাট ব্যানার ডাউনলোড করুন
Download PhotoCut

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here