লামা-আলীকদমে সংকট তীব্র, দীর্ঘদিন ধরে শূন্য ধর্মীয় শিক্ষকের পদ
মোঃ তৌহিদুল ইসলাম,
দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ধরে বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে থাকায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে জেলার লামা ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর নিয়োগ না হওয়ায় এসব বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি হয়। এ সময়ে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষক না থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে বিষয়টি নিয়মিতভাবে পাঠদান করা সম্ভব হচ্ছে না।
লামা ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম জনপদে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। পাহাড়ি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এসব উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট এমনিতেই প্রকট। তার ওপর দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদানে তৈরি হয়েছে বাড়তি ঘাটতি। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে কর্মরত অন্যান্য শিক্ষক অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে ধর্মীয় বিষয় পড়ানোর চেষ্টা করলেও নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে তা কতটা কার্যকর—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, একটি পদ বছরের পর বছর শূন্য থাকা শুধু প্রশাসনিক ঘাটতি নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, আবার অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে চলে যাচ্ছে। কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষকের পদ পূরণ না হওয়ায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই সংকটের মধ্য দিয়ে শিক্ষা জীবন শেষ করছে।
লামা ও আলীকদমের স্থানীয় অভিভাবকরা বলেন, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ই অনেক সময় শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। সেখানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ে। ফলে শহর ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তাদের প্রশ্ন, যে পদে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি, সেই পদগুলো কেন শূন্য পড়ে আছে? এসব পদে নিয়োগের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না এবং হলে তা বাস্তবায়নে এত দীর্ঘ সময় লাগছে কেন—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন তারা।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, ধর্মীয় শিক্ষা কেবল ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; শিশুদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও মানবিক গুণাবলি বিকাশেও এর ভূমিকা রয়েছে। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
বিশেষ করে লামা ও আলীকদমের মতো দুর্গম পাহাড়ি উপজেলার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে।
অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত লামা ও আলীকদমসহ বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য থাকা ধর্মীয় শিক্ষকের পদগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, শূন্যতার কারণ অনুসন্ধান এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ ১৮ বছরের এই শিক্ষক সংকট আর দীর্ঘায়িত না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। পাহাড়ি জনপদের শিশুরাও যাতে দেশের অন্যান্য এলাকার শিশুদের মতো সমানভাবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ পায়—এটাই এখন স্থানীয় অভিভাবকদের প্রধান দাবি।
তবে ১৮ বছর ধরে পদ শূন্য থাকার তথ্যের সুনির্দিষ্ট সরকারি নথি, বিদ্যালয়ভিত্তিক শূন্য পদের সংখ্যা ও কোন কোন বিদ্যালয়ে কত বছর ধরে পদ শূন্য—এসব তথ্য সরকারি রেকর্ড দিয়ে যাচাই করে প্রকাশ করা হলে প্রতিবেদনটি আরও শক্তিশালী ও অনুসন্ধানী হবে।





