ভিশন২৪বাংলা ডেস্ক নিউজ

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র (মাইনর) মেরামতের বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের দেওয়া অর্থ কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। কোথাও একই কাজ দুই প্রকল্পে দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, কোথাও অস্তিত্বহীন দোকানের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার, আবার কোথাও কাজ না করেই বরাদ্দের টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে কয়েকটি বিল-ভাউচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দোকানমালিকদের বক্তব্যেরও মিল পাওয়া যায়নি।

প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আলীকদম উপজেলার সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাইনর মেরামতের জন্য দেড় লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি (এসএমসি) অথবা এডহক কমিটির মাধ্যমে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এসব কাজ বাস্তবায়নের কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ না করেই কিংবা অন্য প্রকল্পের কাজকে মাইনর মেরামতের কাজ হিসেবে দেখিয়ে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

অভিযোগের মাত্রা আরও গুরুতর হয়েছে আইএসও কম্পোনেন্ট-১-এর অধীনে প্রি-প্রাইমারি অ্যান্ড প্রাইমারি এডুকেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় স্কুল ও শ্রেণিকক্ষ সুসজ্জিতকরণ এবং সংস্কার প্রকল্পের বরাদ্দের সঙ্গে মাইনর মেরামতের হিসাবের অসংগতিতে। এ প্রকল্পে আলীকদম উপজেলার ২০টি বিদ্যালয়ে সাত লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রকল্পের কাজ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ভুয়া ভাউচারে পাম্প-ফ্যান কেনার হিসাব!

সরেজমিনে সোনাইছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষক মো. মোকাম্মেল আমিন কুতুবীর কাছে মাইনর মেরামতের কাজের বিল-ভাউচার দেখতে চান প্রতিবেদক। তিনি নয়টি ভাউচার প্রদর্শন করেন। এর মধ্যে প্রথম ভাউচারে একটি সাবমারসিবল পাম্প ও দুটি বৈদ্যুতিক সিলিং ফ্যান কেনার জন্য ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়। বিলটি লামা বাজারের আবরার টেলিকমের নামে করা।

কিন্তু আবরার টেলিকমের মালিক রিদুয়ানুল হক জানান, তাঁর দোকানে মোবাইলের যন্ত্রাংশ বিক্রি হয়। পানির মোটর কিংবা বৈদ্যুতিক ফ্যান বিক্রি করা হয় না। তাঁর ভাষ্য, প্রধান শিক্ষক মোকাম্মেল তাঁর কাছ থেকে খালি ভাউচার নিয়ে গিয়েছিলেন।

শুধু এই একটি ভাউচারই নয়, প্রদর্শিত অন্য ভাউচারগুলোর সত্যতাও সরেজমিনে যাচাই করতে গিয়ে অসংগতি পাওয়া যায়। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুর মোহাম্মদ ও মো. ইউনুচ জানান, মাইনর মেরামতের জন্য কোনো বরাদ্দ এসেছে কিংবা কী কাজ হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকই বলতে পারবেন।

তবে রাজস্ব খাতের আওতায় ঠিকাদারের মাধ্যমে সাত লাখ টাকার কাজ হয়েছিল বলে তাঁরা জানেন। সেই কাজেও অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত চলছে বলে তাঁদের বক্তব্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, রাজস্ব খাতের সাত লাখ টাকার প্রকল্পে ঠিকাদার যে কাজ করেছেন, সেসব কাজকেই আবার মাইনর মেরামতের কাজ হিসেবে দেখিয়ে দেড় লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামাল হোসেনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করেন তাঁরা।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, প্রদর্শিত কয়েকটি বিল-ভাউচার ও রেজুলেশনে প্রধান শিক্ষক ছাড়া অন্য কারও স্বাক্ষর নেই। কাজের পূর্বপরিকল্পনা বা যথাযথ পরিকল্পনাপত্র তৈরির বিষয়েও অসংগতি রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সিমেন্ট, রড ও গ্রিলের কাজের বিল; দোকানমালিকদের অস্বীকার!

একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে আলীকদম বাস টার্মিনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হোছনগীর মাইনর মেরামতের কাজের যেসব বিল-ভাউচার দেখিয়েছেন, সেসব কাজের অনেকগুলোই সাত লাখ টাকার স্কুল ও শ্রেণিকক্ষ সুসজ্জিতকরণ প্রকল্পের আওতায় ঠিকাদার করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

অর্থাৎ একই সময়ে দুটি পৃথক প্রকল্পের বরাদ্দ থাকলেও এক প্রকল্পের কাজ অন্য প্রকল্পের হিসাবেও দেখানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

প্রধান শিক্ষকের প্রদর্শিত ভাউচারের দ্বিতীয় বিলে আলীকদম বাসস্টেশনসংলগ্ন আল আমিন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ থেকে ৩২ হাজার ৫০০ টাকার রড কেনার হিসাব দেখানো হয়েছে। চতুর্থ বিলে গ্রিল মিস্ত্রির মজুরি বাবদ ২৩ হাজার টাকা ব্যয়ের উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাব্বির জানান, তাঁর দোকান থেকে কোনো লোহার বার কেনা হয়নি এবং গ্রিলের কাজও করা হয়নি।

অন্যদিকে তৃতীয় বিলে ৫০ ব্যাগ সিমেন্ট কেনার জন্য ২৭ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে বাস টার্মিনালের মেসার্স আকবর ট্রেডার্সে যোগাযোগ করা হলে দোকানমালিক জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে ওই বিদ্যালয়ের জন্য কোনো সিমেন্ট নেওয়া হয়নি। বিলের লেখাও তাঁর নয়; খালি বিল নিয়ে পরে অন্যরা লিখেছেন।

এ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরাও মাইনর মেরামতের কাজ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।

বরাদ্দের টাকা কোথায় গেল?

মাইনর মেরামতের দেড় লাখ টাকা থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ কাটার বিষয়েও চাঞ্চল্যকর বক্তব্য দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হোছনগীর। তাঁর দাবি, বরাদ্দের অর্থ থেকে ৩০ হাজার টাকা ভ্যাট ও আয়কর বাবদ কাটা হয়েছে। এ ছাড়া ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, ব্যাংকের ক্যাশিয়ারকে পাঁচ হাজার টাকা এবং প্রকৌশলী ও শিক্ষা অফিসে বিভিন্ন খরচ দিতে হয়েছে।

সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এসব অতিরিক্ত খরচের যৌক্তিকতা ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অর্থ কার কাছে, কী উদ্দেশ্যে এবং কোন বিধির আওতায় দেওয়া হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ব্যাখ্যা ও নথিপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন।

চার মাসেও শুরু হয়নি মেরামতের কাজ!

ছাবের মিয়া পাড়া আব্দুল হামিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মাইনর মেরামতের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি এখনো কাজ করেননি। কিছুদিনের মধ্যে কাজ করবেন।

কিন্তু বরাদ্দ পাওয়ার প্রায় চার মাস পেরিয়ে গেলেও কাজ শুরু না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। সরকারি অর্থ বরাদ্দের পরও কেন নির্ধারিত সময়ে কাজ বাস্তবায়িত হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সাত বিদ্যালয়ে দেড় লাখ টাকা করে বরাদ্দ

২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাইনর মেরামতের জন্য বরাদ্দ পাওয়া সাতটি বিদ্যালয় হলো—

১. আলীকদম বাস টার্মিনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (কোড: ১৬৯৩৭১)। ২. ছাবের মিয়া পাড়া আব্দুল হামিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (কোড: ১৪২০৬২)। ৩. সোনাইছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (কোড: ১৬৯৩৫৬)। ৪. মেনক্য মেনকক পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (কোড: ১৬৯৫৩৩)। ৫. দয়াল চন্দ্র পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (কোড: ১৬৯৩৫৯)। ৬. মেজর জামানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (কোড: ১৪২০৫৭)। ৭. চৈক্ষ্যং মৈত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (কোড: ১৬৯৩৭০)।

প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে বরাদ্দের পরিমাণ ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

শিক্ষা কর্মকর্তার দাবি, সব অর্থ বিধি মোতাবেক ব্যয়

অভিযোগের বিষয়ে আলীকদম উপজেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) কামাল হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দপ্রাপ্ত সকল টাকাই বিধি মোতাবেক ব্যয় করা হয়েছে। মাইনর মেরামতে কোনো অনিয়ম হয়নি।’

তবে সরেজমিনে পাওয়া ভাউচারের অসংগতি, দোকানমালিকদের বক্তব্য এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অজ্ঞতার বিষয়গুলো তাঁর দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ইউএনওর

এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, ‘স্কুল/শ্রেণিকক্ষ সুসজ্জিতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের অধীনে ২০টি স্কুলে সাত লাখ টাকা করে বরাদ্দের অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে তদন্ত চলছে। মাইনর মেরামতেরও অনিয়মের তথ্য পেয়েছি। তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য বরাদ্দ করা অর্থের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। অথচ সেই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভুয়া ভাউচার, একই কাজ একাধিক প্রকল্পে দেখানো এবং কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের আগে ও পরে তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কীভাবে এসব অনিয়মের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন? প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কত টাকা আত্মসাৎ হয়েছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।

শুধু কাগজপত্র যাচাই নয়, প্রতিটি বিদ্যালয়ের সরেজমিন পরিমাপ, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, ব্যাংক লেনদেন, ভ্যাট-আয়কর জমার প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট দোকানমালিকদের বক্তব্য যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। একই সঙ্গে সাতটি বিদ্যালয়ের মাইনর মেরামত এবং ২০টি বিদ্যালয়ের সাত লাখ টাকা করে বরাদ্দের প্রকল্পের ব্যয় আলাদাভাবে নিরীক্ষার দাবি উঠেছে।

শিক্ষার্থীদের উন্নয়নের অর্থ যদি কাগজে-কলমে উন্নয়ন দেখিয়ে লোপাট হয়ে থাকে, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

🖨️ প্রিন্ট নিউজচ্যানেল স্টাইল ফটো-কাট ব্যানার ডাউনলোড করুন
Download PhotoCut

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here