

রুমা (বান্দরবান) প্রতিনিধি
বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম হমক্রি পাড়ায় পৌঁছাতে মংপ্রু পাড়া থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে যেতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নিরাপদ স্যানিটেশনের ঘাটতিতে দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে ম্রো সম্প্রদায়ের এই জনপদ। সরকারি বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফলও এখানকার বাসিন্দারা পর্যাপ্তভাবে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি সরকারি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে হমক্রি পাড়া পরিদর্শনে গিয়ে এসব চিত্র তুলে ধরেছেন রুমা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আল হাসির গুঞ্জন। তিনি ভেরিফাইড তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন:
:কারবারির নামে পাড়ার নাম :
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হমক্রি পাড়ার আগের নাম ছিল ‘রিংতুই পাড়া’। ম্রো সমাজে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, পাড়ার কারবারি (প্রধান) যিনি হন, তাঁর নামেই পাড়ার নামকরণ করা হয়। বর্তমানে কারবারি হমক্রি ম্রোর নাম অনুসারেই পাড়াটির বর্তমান নাম।
:৪৫ পরিবারের বসতি, নেই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন:
হমক্রি পাড়ায় প্রায় ৪৫টি পরিবারের বসবাস। কিন্তু পুরো পাড়ায় সরকারি প্রকল্পের আওতায় নির্মিত টয়লেট রয়েছে মাত্র তিনটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাশের কিছু এলাকায় প্রায় প্রতিটি পরিবার টয়লেট সুবিধা পেলেও তাঁদের পাড়া বরাবরই অবহেলিত থেকে গেছে।
: স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত:
পাড়াটিতে কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা নেই। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীকে প্রথমে কয়েক ঘণ্টা পাহাড়ি পথে কাঁধে বহন করে মূল সড়কে আনতে হয়, এরপর হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গর্ভবতী নারীদের প্রসবকালীন জরুরি পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্ষাকালে যোগাযোগব্যবস্থা আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় চিকিৎসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
দুর্গম পথ, বিচ্ছিন্ন জনপদ :
হমক্রি পাড়ায় যাওয়ার কোনো পাকা সড়ক নেই। স্থানীয়দের চলাচলের জন্য তৈরি হওয়া পাহাড়ি পথই একমাত্র ভরসা। শুষ্ক মৌসুমে সীমিতভাবে যানবাহন চললেও বর্ষাকালে পুরো এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বহুবার রাস্তার দাবি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
: বিশুদ্ধ পানির সংকট:
পাহাড়ি ঝিরির পানিই এখানকার মানুষের প্রধান পানির উৎস। অতীতে একটি প্রকল্পের আওতায় পানির ট্যাংক ও পাইপলাইন স্থাপন করা হলেও তা বর্তমানে অচল। ফলে বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগেই পানির ব্যবস্থা করছেন।
জীর্ণ স্কুলে চলছে পাঠদান
২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হমক্রি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫১ জন শিক্ষার্থী ও পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। তবে বিদ্যালয় ভবনটি জরাজীর্ণ। তিনটি শ্রেণিকক্ষের জন্য রয়েছে মাত্র দুটি টেবিল। বেঞ্চ ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণেরও সংকট রয়েছে। শিক্ষকদের থাকার জন্য অস্থায়ী মাচাংঘরের মতো একটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, খেলাধুলার সামগ্রী ও উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশের অভাবে শিশুদের বিদ্যালয়ে আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভাষাগত বাধায় কৃষি সম্প্রসারণেও সমস্যা :
হমক্রি পাড়ার অধিকাংশ কৃষক ম্রো ভাষায় কথা বলেন। তাঁদের অনেকেই বাংলা ভালোভাবে বোঝেন না। ফলে উপজেলা পর্যায়ে আয়োজিত কৃষি প্রশিক্ষণের অনেক বিষয় তাঁদের কাছে বোধগম্য হয় না।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ড্রাগন ফলের মতো উচ্চমূল্যের ফসলের ক্ষেত্রে কৃত্রিম পরাগায়নের গুরুত্ব সম্পর্কে ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক যথাযথ ধারণা পান না। এতে উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উৎপাদন আছে, নেই ন্যায্যমূল্য:
হমক্রি পাড়ায় ড্রাগন ফলের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে কয়েক বছর আগে। তবে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কৃষকেরা উৎপাদিত ফল ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারেন না।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড় থেকে মূল সড়ক পর্যন্ত প্রায় ১০ মণ ড্রাগন ফল বহন করতেই কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়। এরপর রয়েছে ট্রাকভাড়া ও অন্যান্য পরিবহন ব্যয়। ফলে বাজারে ভালো দাম থাকলেও কৃষকের হাতে লাভের পরিমাণ অনেক কমে যায়।
*তরুণ কৃষকদের উদ্যোগ :
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, হমক্রি পাড়ার একটি ইতিবাচক দিক হলো এখানকার অধিকাংশ কৃষক তরুণ। তাঁরা সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্য বাজারজাত করার চেষ্টা করছেন। কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সময়ে বীজ, চারা, জৈবসারসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
দুর্গম এলাকায় নিয়মিত কৃষিসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উন্নয়নের মূলধারা থেকে দূরে :
স্থানীয়দের মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নিরাপদ পানির মতো মৌলিক সেবার ঘাটতির কারণে ম্রো জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁদের দাবি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো হলে এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
স্থানীয়দের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দুর্গম এই জনপদগুলোর বাস্তব চিত্র বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যাতে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কাটিয়ে তারাও উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত হতে পারেন।
শৈহ্লাচিং মার্মা
রুমা প্রতিনিধি





