সাধু

সাধু হতে চাইলে আগে প্রেমিক হও। কথাটা শুনতে ছোট, কিন্তু এর ভিতরেই পুরো মারফত লুকিয়ে আছে।

আমরা সবাই সাধু হতে চাই, কিন্তু প্রেমিক হতে চাই না। আমরা চাই জট-জটা, তসবি-মালা, লোকের সালাম। বাউল বলে – ওগুলো সাধুর পোশাক, সাধু না। সাধু হয় মনে।

আর মনে সাধু হওয়ার প্রথম সিঁড়িই হলো প্রেমিক হওয়া।
১. কামী কে? প্রেমিক কে?
এই দুইটাকে চিনতে না পারলে সারা জীবন ভুল রাস্তায় হাঁটবা।

কামী: কামী চায়। তার সবকিছুর শেষে একটা ‘চাই’ আছে। সে বলে – আমি তোমাকে চাই, তোমার শরীর চাই, তোমার সেবা চাই। কামীর হাত সবসময় মুষ্টিবদ্ধ, সে শুধু নিতে জানে। সে নদীর মতো না, সে গর্তের মতো – যতই ঢালো, ভরে না।

কামীর প্রেমে ভয় থাকে। যদি হারিয়ে যায়? যদি না পাই? তাই সে তাড়াহুড়া করে, জোর করে, বেঁধে রাখতে চায়।

প্রেমিক: প্রেমিক চায় না, প্রেমিক দেয়। তার সবকিছুর শেষে একটা ‘দিলাম’ আছে। সে বলে – আমি তোমার জন্য আছি, তোমার সুখে আমি সুখী। প্রেমিকের হাত সবসময় খোলা, সে দিতে জানে।

প্রেমিকের প্রেমে ভয় নাই, ভরসা আছে। সে জানে, প্রেম বেঁধে রাখার জিনিস না, প্রেম মুক্ত করে দেওয়ার জিনিস।

বাউলরা এই জন্য বলে – কামী ভোগ খোঁজে, প্রেমী যোগ খোঁজে।
২. কামী কেন সাধু হতে পারে না?
কারণ কামীর ভিতরে ‘আমি’ অনেক বড়।

সে যখন আল্লাহকে ডাকে, তখনও বলে – আল্লাহ, আমাকে দাও। আমাকে জান্নাত দাও, আমাকে ক্ষমতা দাও, আমাকে কেরামতি দাও।

আল্লাহর কাছে ‘আমি’ নিয়ে যাওয়া যায় না। ‘আমি’ টা রেখে আসতে হয় দরজার বাইরে।

কামী তার বীর্য, তার শক্তি, তার রূপ – সবকিছুকে নিজের সম্পত্তি মনে করে খরচ করে ফেলে। তার ভাণ্ডার সবসময় খালি। খালি ভাণ্ডার নিয়ে সাধনা হয় না।

আর যে নিজের দেহের আমানতই রক্ষা করতে পারলো না, সে আল্লাহর দেওয়া বড় আমানত – এই রুহ, এই প্রেম – সেটা কিভাবে রক্ষা করবে?
৩. প্রেমিক কিভাবে সাধু হয়?
প্রেমিক আগে একটা মানুষকে ভালোবাসতে শেখে। একজন নারীকে, একজন মানুষকে, নিঃস্বার্থভাবে।

যখন সে একজন মানুষকে কাম ছাড়া ভালোবাসতে পারে – তার শরীর না, তার মনকে, তার কষ্টকে, তার আত্মাকে ভালোবাসতে পারে – তখন তার ভিতরে একটা চোখ খোলে।

সুফিরা বলে, এটা হলো ইশকে মাজাজি – মানুষের প্রেম। এই প্রেম হলো স্কুল। এই স্কুলে পাশ না করলে ইশকে হাকিকি – আল্লাহর প্রেমের ক্লাসে ভর্তি হওয়া যায় না।

প্রেমিক যখন তার প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করে, তার জন্য কাঁদে, তার জন্য নিজের সুখ ছেড়ে দেয় – তখন সে আসলে আল্লাহর জন্য অপেক্ষা করা, কাঁদা, ছেড়ে দেওয়া শিখে যায়।

তখন তার জিকির আর মুখে থাকে না, তার জিকির তার বুকের ভিতরে চলতে থাকে। তখন সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থির থাকতে পারে, কারণ তার ভিতরে আর কোনো তাড়াহুড়া নাই। তার ভিতরে শুধু একটা শান্ত নদী বইছে – প্রেমের নদী।

লালন তাই বলেছে –
“প্রেমিক বিনে সাধু হয় না,
প্রেম না থাকলে আল্লাহ রয় না।”
তাই যদি সাধু হতে চাও, তসবি আগে না, আগে প্রেমিক হও। একটা মানুষকে এমনভাবে ভালোবাসো যেন তার সুখে তোমার সুখ, তার কষ্টে তোমার কষ্ট। তার দিলে আঘাত দেওয়ার আগে তোমার নিজের বুকে আঘাত লাগে।

যেদিন তুমি কামী থেকে প্রেমিক হতে পারবে, সেদিন দেখবে – সাধু হওয়ার জন্য আর আলাদা কিছু করতে হচ্ছে না। প্রেমিক হওয়াটাই তোমাকে সাধু বানিয়ে দিয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments