
| দালালের মাধ্যমে পালিয়ে কাজের সন্ধানে পাহাড়ে আশ্রয়, নিরাপত্তা ও মানবপাচার নিয়ে নতুন উদ্বেগ |
তৌহিদুল ইসলাম, আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি
কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছে রোহিঙ্গারা। দালালচক্রের সহায়তায় ক্যাম্প ছেড়ে কাজের সন্ধানে পাহাড়ে প্রবেশের এমন একটি ঘটনায় সাত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পরে তাদের পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আলীকদম থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানবপাচার এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধী নেটওয়ার্কের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আলীকদম ব্যাটালিয়ন (৫৭ বিজিবি) সূত্রে জানা যায়, গত ৭ নভেম্বর রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে আলীকদম ব্যাটালিয়নের ২ নম্বর জিপি গেটসংলগ্ন সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে সাতজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে পরিচয় দেয়।
বিজিবির জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আটক ব্যক্তিরা প্রায় দুই মাস আগে দালালচক্রের মাধ্যমে কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসে। কাজের সন্ধানে তারা বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া এলাকার ম্রো পাড়ায় অবস্থান করছিল বলে জানায়।
আটক সাতজনের মধ্যে কক্সবাজারের ১৪ নম্বর হাকিমপাড়া ক্যাম্পের তিনজন, ১৭ নম্বর বালুখালী ক্যাম্পের দুজন, ১৮ নম্বর বালুখালী ক্যাম্পের একজন এবং ৯ নম্বর বালুখালী ক্যাম্পের একজন রয়েছেন।
পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ৮ নভেম্বর রাত ২টার দিকে তাদের আলীকদম থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সহায়তা ও প্রত্যাবাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে মাদক কারবার, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এসব অপরাধে জড়িত রয়েছে বিভিন্ন সংঘবদ্ধ চক্র। তাদের সঙ্গে স্থানীয় ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধী নেটওয়ার্কের যোগসূত্রের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে এসব অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও দায় নির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা জরুরি।
২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদারে নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ক্যাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া সংস্কার, সিসিটিভি ক্যামেরা, সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতি ও নজরদারি টাওয়ার স্থাপনের পাশাপাশি অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় দুটি নতুন সেনাক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। মাদক পাচার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতাও ওই বৈঠকে আলোচনায় আসে।
এদিকে ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গিখালী পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। এর আগে ওই অভিযানে ৫৭ জনকে উদ্ধার ও পাঁচজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়। অভিযানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে সেনাবাহিনীর এক সদস্য নিহত হন। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন রোহিঙ্গা এবং ৫১ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। ঘটনাটি সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে মানবপাচারকারী চক্রের ভয়াবহ তৎপরতার চিত্র সামনে এনেছে।
অন্যদিকে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধের চিত্রও উদ্বেগজনক। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানভিত্তিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক ১ হাজার ৬৫০টির বেশি মাদক মামলা এবং ১৮১টি অস্ত্র মামলা হয়েছিল। এসব অস্ত্র মামলায় আসামি করা হয়েছিল ৪৮০ জনকে। এসব পরিসংখ্যান আগের সময়ের; বর্তমান পরিস্থিতির সঠিক চিত্র জানতে হালনাগাদ সরকারি তথ্য প্রয়োজন।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে দালালের মাধ্যমে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থানের বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে স্থানীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সচেতন মহলকে। দুর্গম পাহাড়ি জনপদ, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিস্তৃত সীমান্তবর্তী ভূপ্রকৃতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপরাধী চক্র যাতে এসব এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে আগাম সতর্কতা প্রয়োজন।
বিশেষ করে আলীকদম, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় অপরিচিত ব্যক্তিদের অবাধ চলাচল, সন্দেহজনক অবস্থান এবং দালালচক্রের তৎপরতা নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।
তবে আটক সাতজনের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, অপহরণ কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য বিজিবির প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার আগে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসার পেছনে সক্রিয় দালালচক্র শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
শুধু পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের আটক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; তাদের ক্যাম্প থেকে বের করে আনা দালাল, পরিবহন ও আশ্রয়দাতা নেটওয়ার্কের মূল হোতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং মানবপাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ তৌহিদুল ইসলাম, নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ রায়হান, বার্তা সম্পাদকঃ সুজন চৌধুরী, ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপকঃ মোহাম্মদ এহসান,..।
Allright Reserve https://vision24bangla.net@2026