সংবাদ প্রকাশের পরও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই, বন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন; রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমানকে ঘিরে অভিযোগ
এস. এম. হুমায়ুন কবির, কক্সবাজার
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জে পাহাড় কেটে পাঁচ কক্ষের একটি মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ফকিরা বাজারের উত্তর-পশ্চিমে মাদার গর্জনগাছবেষ্টিত পাহাড়ের একটি অংশ কেটে কাঠ ও টিনের এই স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় বনভূমি রক্ষায় বন প্রশাসনের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফুলছড়ি রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমানের দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও নথিভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু ফকিরা বাজারের এই মার্কেটই নয়, ফুলছড়ি রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি দখল করে আধাপাকা ও বহুতল ভবন নির্মাণের ঘটনাও ঘটছে। গত এক বছরে কয়েক একর বনভূমি দখলের অভিযোগ তুলে তাঁরা বলছেন, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও বসতবাড়ি নির্মাণের ঘটনা চলতে থাকলে বনাঞ্চল রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে।
সংবাদ প্রকাশের পরও ব্যবস্থা কোথায়?
ফকিরা বাজারসংলগ্ন পাহাড় কেটে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ নিয়ে দৈনিক গণমুক্তি, দৈনিক ঘোষণা, দৈনিক আজকের আওয়াজসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মারুফ হোসেন এর আগে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে সংবাদ প্রকাশের পর ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে দাবি স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের। যদিও এ সময়ের মধ্যে বন বিভাগ কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের তদন্ত, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণে বন বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ্যে একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট বন বিট ও রেঞ্জ কর্মকর্তাদের নজরদারি ছিল কি না। বিষয়টি জানা থাকলে নির্মাণকাজ বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? আর জানা না থাকলে নিয়মিত তদারকির ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
৯ হাজার ৯৩৮ একর বনভূমির দায়িত্বে ফুলছড়ি রেঞ্জ
বন বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফুলছড়ি রেঞ্জে সংরক্ষিত বনভূমির পরিমাণ ৯ হাজার ১০৩ একর এবং রক্ষিত বনভূমি ৮৩৫ একর। সব মিলিয়ে এ রেঞ্জের আওতায় রয়েছে ৯ হাজার ৯৩৮ একর বনভূমি। পাঁচটি বন বিট নিয়ে গঠিত এই রেঞ্জের বিশাল বনাঞ্চল সংরক্ষণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাদের ওপর।
অন্যদিকে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পুরো বিভাগের বনভূমির পরিমাণ ৩৫ হাজার ৬.৪৯ হেক্টর। এর মধ্যে সংরক্ষিত বনভূমি ২৯ হাজার ১৮৪.২৭ হেক্টর, রক্ষিত বনভূমি ৫ হাজার ৭৯৫.৬৪ হেক্টর এবং অর্পিত বনভূমি ২৬.৫৮ হেক্টর।
বিপুল পরিমাণ বনভূমি সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা একটি রেঞ্জের মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় পাহাড় কেটে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ ওঠায় তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে মার্কেটটি ঠিক কোন শ্রেণির জমিতে নির্মিত, জমির দাগ-খতিয়ান কী বলছে এবং পাহাড় কাটার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
বাড়িঘর নির্মাণে ৭০–৯০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
ফুলছড়ি রেঞ্জের বনভূমিতে বাড়িঘর নির্মাণের সুযোগ করে দিতে বাড়িপ্রতি ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকটি সূত্র। বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
ফুলছড়ি রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমানের বিরুদ্ধে বনভূমি রক্ষা ও তদারকি নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
আগেও উঠেছিল বনভূমি দখলের অভিযোগ
ফুলছড়ি রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে আগেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ফুলছড়ি রেঞ্জ এলাকায় কয়েক বছরে প্রায় ৫০০ একর বনভূমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।
অন্যদিকে ফুলছড়ির সহকারী বনসংরক্ষক শহিদুল হাসান শাকিল এর আগে জানিয়েছিলেন, তিনি নতুন যোগদান করায় পাহাড় কাটা কিংবা মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে তাঁর কাছে তথ্য নেই। তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মারুফ হোসেন এর আগে বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে ফকিরা বাজারের সর্বশেষ অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ কারণে এ ঘটনায় বন বিভাগের সর্বশেষ অবস্থান এবং কোনো তদন্ত বা অভিযান পরিচালিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি
স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের দাবি, ফকিরা বাজারের পাঁচ কক্ষের মার্কেটটির জমির দাগ-খতিয়ান, সীমানা নকশা ও মালিকানাসংক্রান্ত নথি যাচাই করে নির্মাণের বৈধতা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ের কতটুকু অংশ কাটা হয়েছে, পরিবেশের কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে এবং বনভূমি দখলের অভিযোগে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনতে হবে।
তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট বন বিটের নথি, বনভূমি দখলসংক্রান্ত মামলা, উচ্ছেদ অভিযানের প্রতিবেদন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ পর্যালোচনা করা জরুরি। তদন্তে অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বনভূমি রক্ষা শুধু স্থাপনা উচ্ছেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নিয়মিত নজরদারি, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফুলছড়ি রেঞ্জে ৯ হাজার ৯৩৮ একর বনভূমি সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের কাছে তাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা—অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তদন্ত, নথিভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং গৃহীত পদক্ষেপের স্বচ্ছ বিবরণ।
ফকিরা বাজারের মার্কেটটি কোন জমিতে নির্মিত, পাহাড় কাটার অভিযোগ কতটা সত্য এবং সংবাদ প্রকাশের পর বন বিভাগ কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যই পারে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে এবং বনভূমি সংরক্ষণে জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে।


