কক্সবাজারের ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমানের বিরুদ্ধে বনভূমি দখল ও পাহাড় কাটার অভিযোগ; তদন্তের দাবি স্থানীয়দের
এস. এম. হুমায়ুন কবির, কক্সবাজার
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের আওতাধীন বনভূমিতে বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণ, পাহাড় কেটে স্থাপনা তৈরি এবং বাড়িঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ফকিরা বাজারের উত্তর-পশ্চিম দিকে বন বিভাগের জমিতে গড়ে উঠেছে মার্কেট। এসব স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ফুলছড়ি রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বাড়িপ্রতি ৭০–৯০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের জমিতে বাড়িঘর নির্মাণের জন্য প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু আবাসিক স্থাপনা নয়, বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অর্থ কারা দিয়েছেন, কাদের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে এবং অর্থ নেওয়ার পেছনে কী ধরনের সমঝোতা ছিল—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নথিপত্র বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে ফকিরা বাজারের উত্তর-পশ্চিম পাশে বন বিভাগের জমিতে নির্মিত মার্কেট দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই এলাকায় বনভূমির সীমানা, জমির শ্রেণি, স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন এবং পাহাড় কাটার অভিযোগ খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
আগেও বনসম্পদ ধ্বংসের অভিযোগ
ফুলছড়ি রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি দখল ও গাছ কাটার অভিযোগ আগেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে নাপিতখালী বিটের গ্রামপাড়া ও হাতির ডুরি পাহাড় এলাকায় গর্জনগাছ কাটার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
একই বনাঞ্চল ঘিরে বারবার অভিযোগ ওঠায় বন বিভাগের নজরদারি, বনভূমি দখল প্রতিরোধ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, বনভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ হয়ে থাকলে তা কীভাবে সম্ভব হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ছিল কি না এবং অভিযোগ পাওয়ার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
রেঞ্জ অফিসে ব্যক্তিগত কক্ষ নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ফুলছড়ি রেঞ্জ অফিসের দ্বিতীয় তলায় ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তার জন্য একটি ব্যক্তিগত কক্ষ তৈরি করা হয়েছে এবং তিনি সেখানে বিশ্রাম নেন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন প্রয়োজনে অফিসে গিয়ে অনেক সময় তাঁকে না পেয়ে ফিরে আসতে হয়।
তবে অফিসে তাঁর উপস্থিতি, দায়িত্ব পালনের সময়সূচি এবং এ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি ও দায়িত্ব পালনের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি রেঞ্জ কর্মকর্তার
মোহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রেঞ্জ কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে একাধিক সাংবাদিক বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি। প্রায় ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তাঁর পক্ষ থেকে ফিরতি ফোন বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন।
ফলে বাড়িঘর নির্মাণ ও মার্কেট তৈরির ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ এবং বনভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
‘আমি নতুন এসেছি, এসবের তথ্য নেই’
ফুলছড়ির সহকারী বনসংরক্ষক শহিদুল হাসান শাকিল বলেন, “আমি নতুন এসেছি। পাহাড়কর্তন কিংবা মার্কেট নির্মাণের কোনো তথ্য নেই। তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের পর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
‘বন বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জিরো টলারেন্স’
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মারুফ হোসেন বলেন, “বন বিধ্বংসী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমার জিরো টলারেন্স। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিভাগীয় বন কর্মকর্তার এ বক্তব্যের পর স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে বনভূমির প্রকৃত মালিকানা ও সীমানা নির্ধারণ, স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন যাচাই এবং কথিত অর্থ লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হোক।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বন বিভাগের জমির রেকর্ড, স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে কি না, তা সরেজমিনে পরীক্ষা করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বনভূমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ ও অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বনভূমি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।


