
বিদ্যুৎ-নেটওয়ার্কহীন জনপদে চিকিৎসা ও শিক্ষায় সংকট, নেই স্থায়ী ইউপি ভবন; কৃষিপণ্য বাজারজাতেও বাড়তি খরচ
ডেস্ক নিউজ
একসময় দুর্গম বলে পরিচিত বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা কুরুকপাতা ইউনিয়নের যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। কিন্তু সড়ক যেখানে শেষ, সেখান থেকেই যেন শুরু হয় মানুষের আরেক বাস্তবতা। বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট নেই; নেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ভবন। ফলে সড়ক পৌঁছালেও নাগরিক সেবা ও জীবনমানের উন্নয়ন যেন আটকে আছে দুর্গম পাহাড়েই।
সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে কুরুকপাতায় বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, মাধ্যমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সংকটের কথা উঠে এসেছে।
কুরুকপাতা ইউনিয়নে ম্রো, ত্রিপুরা, খুমি-সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী ইউনিয়নটির জনসংখ্যা ১১ হাজার ২১৬; স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের হিসাবে বর্তমানে এ সংখ্যা আরও বেশি।
সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকার
দিনের আলোয় পাহাড়ি জনপদটির চিত্র যতটা বদলে যায়, সূর্য ডোবার পর বাস্তবতা ততটাই স্পষ্ট হয়। ইউনিয়নের বহু এলাকায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। কোথাও সৌরবিদ্যুৎ, কোথাও কেরোসিনের বাতি -এভাবেই রাত কাটে। জরুরি প্রয়োজনে অনেকের ভরসা মুঠোফোনের আলো।
ক্রিটলাই পাড়ার বাসিন্দা রইচুং ম্রো বলেন, “সড়ক হয়েছে; কিন্তু নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ—কোনো কিছুই পৌঁছায়নি। এখনো সোলার বাতি আর কেরোসিন ব্যবহার করতে হচ্ছে।”
কুরুকপাতার বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সংকটের কারণে জরুরি রোগীকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়ে বলে স্বাস্থ্যকর্মীদের বরাতে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অসুস্থ হলে ভরসা দূরের উপজেলা
কুরুকপাতার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আলীকদম উপজেলা সদরে যেতে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে হয় বলে স্থানীয়রা জানান। কোথাও সড়ক থাকলেও প্রত্যন্ত পাড়াগুলোতে যেতে নদীপথ ও দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়।
স্বাস্থ্যসেবার সংকট সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে দুর্গম এলাকার মানুষকে। ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় সাধারণ চিকিৎসার জন্যও অনেককে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভর করতে হয়। চলতি বছর কুরুকপাতায় হাম প্রতিরোধে স্বাস্থ্য কার্যক্রম নিয়েও দুর্গমতা, পরিবহন ও বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, “রাতে কেউ অসুস্থ হলে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। কাছাকাছি চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। রোগী নিয়ে বের হতে হয় অনেক দূরের পথে। সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া যাবে কি না, সেই চিন্তাই আগে আসে।”
সিগরুং ত্রিপুরা বলেন, “শহরে যে চিকিৎসা বা পরীক্ষা সহজে করা যায়, আমাদের এখানে সেটা করতে পুরো দিন চলে যায়। গরিব মানুষের জন্য যাতায়াতের খরচও কম নয়। জন্মনিবন্ধনের জন্যও শহরে যেতে-আসতে হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে যায়।”
মাধ্যমিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত
কুরুকপাতা ইউনিয়নে মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের দূরের এলাকায় যেতে হয়। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও বাড়তি ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবারের জন্য সন্তানদের দূরে রেখে পড়াশোনা করানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে পাহাড়ি এ জনপদের শিশু-কিশোরদের একটি অংশ উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কৃষকের পণ্য যায় বাজারে, লাভ যায় অন্যের ঘরে
কুরুকপাতার মানুষের বড় অংশ কৃষিনির্ভর। পাহাড়ি ঢাল, জুম ও নদীর তীরের জমিতে কলা, মিষ্টিকুমড়া ও বিভিন্ন জুমফসল উৎপাদন করেন তাঁরা। কিন্তু উৎপাদনের পর এসব পণ্য বাজারে পৌঁছানোই হয়ে ওঠে আরেক বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্গম এলাকা থেকে কৃষিপণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ হয়। বাজারে পৌঁছানোর পরও পণ্যের দাম নির্ধারণে কৃষকের নিয়ন্ত্রণ সীমিত থাকায় উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ভারসাম্য থাকে না।
সিংপাও ম্রো বলেন, “শহর দূরে হওয়াতেই কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাই না। কলারছড়া, মিষ্টিকুমড়া, জুমের নানা কৃষিপণ্য পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় শহরে গেলে দাম কমে যায়। আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি।”
ইউনিয়ন পরিষদও চলছে ভাড়া করা কক্ষে
কুরুকপাতার নাগরিক সেবা সংকট আরও প্রকট হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব স্থায়ী ভবন না থাকায়। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম উপজেলা সদরের কাছাকাছি একটি ভাড়া করা কক্ষে পরিচালনা করতে হচ্ছে।
কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, “আমার ইউনিয়ন এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট সুবিধা নেই। এ কারণে আলীকদম সদর ইউনিয়ন এলাকায় একটি ভাড়া করা কক্ষ থেকে ইউনিয়নের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে।”
স্থানীয় ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে কুরুকপাতার স্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বন বিভাগের আপত্তিতে ভবন নির্মাণে জটিলতা
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, “আলীকদমের কুরুকপাতা ইউনিয়নে নিজস্ব কার্যালয় নেই। কুরুকপাতাসহ এসব ইউনিয়নের অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ চলছে। তবে রিজার্ভ ফরেস্ট হওয়ায় বন বিভাগের আপত্তির কারণে ইউনিয়ন পরিষদের ভবন নির্মাণে জটিলতা রয়েছে। এ বিষয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তির জন্য চিঠি পাঠানো হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, কুরুকপাতায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক—এসব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। কীভাবে সেখানে নেটওয়ার্ক সুবিধা আনা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে উদ্যোগ নেওয়ার আশা রয়েছে প্রশাসনের।
সড়কের পর এবার প্রয়োজন নাগরিক সেবা
কুরুকপাতায় সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হলেও তার সুফল এখনো ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পাড়াগুলোতে সমানভাবে পৌঁছেনি। ফলে শুধু সড়ক নির্মাণ নয়—বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, মাধ্যমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি।
দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনমান বদলাতে যোগাযোগ অবকাঠামোর পাশাপাশি এসব মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ তৌহিদুল ইসলাম, নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ রায়হান, বার্তা সম্পাদকঃ সুজন চৌধুরী, ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপকঃ মোহাম্মদ এহসান,..।
Allright Reserve https://vision24bangla.net@2026