————–
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও হাম (Measles) রোগের সংক্রমণ নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, টিকাদানের হার কমে গেলে বা সময়মতো টিকা না পেলে শিশুদের মধ্যে দ্রুত এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অভিভাবকদের সচেতনতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোন বয়সের শিশুদের হাম হওয়ার ঝুঁকি বেশি?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী—
- সাধারণত ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে হাম হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
- তবে যে কোনো বয়সের শিশু, এমনকি টিকা না নেওয়া কিশোর বা প্রাপ্তবয়স্কদেরও হাম হতে পারে।
- বিশেষ করে যেসব শিশু হামের টিকা (MR/MMR) নেয়নি বা টিকা অসম্পূর্ণ রয়েছে, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী:
- প্রথম ডোজ: ৯ মাস বয়সে
- দ্বিতীয় ডোজ: ১৫ মাস বয়সে
এই দুটি ডোজ সময়মতো নিলে হাম প্রতিরোধের কার্যকারিতা ৯৫%-এর বেশি হতে পারে—এ তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও যুক্তরাষ্ট্রের CDC-এর প্রকাশিত গাইডলাইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হামের প্রধান লক্ষণ কী কী?
হাম একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। সংক্রমণের ৭–১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত লক্ষণ দেখা দেয়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো—
- উচ্চ জ্বর (১০১–১০৪°F পর্যন্ত হতে পারে)
- কাশি, সর্দি ও চোখ লাল হওয়া
- চোখ দিয়ে পানি পড়া
- মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots)
- শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা দানা, যা প্রথমে মুখে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে
- দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা
গুরুতর ক্ষেত্রে যে জটিলতাগুলো হতে পারে:
- নিউমোনিয়া
- ডায়রিয়া
- কানের সংক্রমণ
- মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis)
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্ট শিশু বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে।
হাম হলে কী করণীয় (প্রতিকার)?
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ সাধারণত দেওয়া হয় না; চিকিৎসা মূলত উপসর্গ অনুযায়ী করা হয়। তবে সঠিক পরিচর্যা অত্যন্ত জরুরি।
প্রাথমিক করণীয়:
- শিশুকে বিশ্রামে রাখা
- প্রচুর তরল খাবার (পানি, স্যুপ, দুধ) দেওয়া
- জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া
- চোখ পরিষ্কার রাখা
- অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা (কমপক্ষে ৪–৫ দিন)
চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি যেসব ক্ষেত্রে:
- জ্বর ৩–৪ দিনের বেশি থাকে
- শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়
- শিশু খেতে না চায় বা অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়ে
- খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে ভিটামিন-A সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হলে জটিলতার ঝুঁকি কমতে পারে—তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে নিতে হবে।
হামের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ কী?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ।
প্রতিরোধের মূল উপায়গুলো:
- নির্ধারিত সময় অনুযায়ী MR/MMR টিকা দেওয়া
- আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা
- নিয়মিত হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
- অপুষ্টি প্রতিরোধে সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও সময়মতো টিকা ও সচেতনতা থাকলে এটি সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের টিকাদান সম্পূর্ণ করা এবং কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্মিলিত সচেতনতা ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বজায় রাখলে হামমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব।


